আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেছেন, বিএনপি মিথ্যা দিবস পালন করার নামে দেশে অরাজকতা তৈরি করতে চাইছে। বিএনপির গণতন্ত্র হত্যা দিবসটি যে মিথ্যা, সেটি প্রমাণ করতে হবে তাকে জনসভা করতে দিয়ে। জনসভা বন্ধ করতে না দিলে তো তাঁর দাবিটিই সত্য বলে গণ্য হবে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের সবিনয়ে জানাই, দিন-তারিখ ধরে গণতন্ত্র রক্ষা হয় না। উদ্ধারও করা যায় না। গণতন্ত্র হলো দীর্ঘ অনুশীলনের বিষয়। সেটি তাঁরা কতটা মেনে চলেন, সেটাই দেখার বিষয়। এই বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবস পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে কি পরিস্থিতি খুব একটা উন্নতি হয়েছে?
নব্বইয়ের পর থেকে ৬ ডিসেম্বর যে স্বৈরাচারের পতন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে, সেই স্বৈরাচার কিন্তু বহাল তবিয়তে। একসময় এই দিবস নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উত্তেজনা ও উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না। দুই দলই ঢাকঢোল বাজিয়ে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার দিবস’ ও ‘স্বৈরাচারের পতন দিবস’ পালন করত। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে পেছনে ফেলে পতিত সামরিক শাসকই ৬ ডিসেম্বর ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা’ করেছেন বলে জোর গলায় প্রচার চালাচ্ছেন। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা দিবসটি পালন করার কথাই ভুলে যান। ২০০০ সালে যখন বিএনপি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামি ঐক্যজোট মিলে চারদলীয় জোট করেছিল, তখন আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছিলেন, ‘সব রাজাকার ও স্বৈরাচার এক হয়েছে।’ পরবর্তীকালে কাজী জাফর-নাজিউর রহমানরা সেই জোটে থেকে গেলেও এরশাদ জোট থেকে বেরিয়ে আসেন। এখন বলার সুযোগ নেই যে ‘সব রাজাকার ও স্বৈরাচার এক হয়েছে।’ কেউ কেউ একের বাইরেও আছেন।
রাজনীতিকদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র দিন-তারিখ ধরে আসে না। স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সরকার বা গণতান্ত্রিক দলের পার্থক্য হলো প্রথমজন বিরোধীদের কথা শুনতে চান না, বরং গায়ের জোরে মুখ বন্ধ করে দেন। আর দ্বিতীয়জন নিজ মতের বিরোধী হলেও তা শোনেন এবং বলার সুযোগ করে দেন। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার যেমন বলেছিলেন, ‘আমি তোমার মতের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি জীবন দিতেও প্রস্তুত আছি।’ এটাই হলো গণতন্ত্র।
আওয়ামী লীগের আপত্তি যদি হয় বিএনপির দিবস, তাহলে তার সমাধান কঠিন নয়। আওয়ামী লীগ নিজে যেমন বিএনপিকে সভা করতে দিয়ে প্রমাণ করতে পারে যে গণতন্ত্র নিহত হয়নি। আর বিএনপিও ‘হত্যা দিবস’ নিয়ে জোরাজুরি না করে অন্য কোনো সময়ে সভা করার দাবি জানাতে পারে। আওয়ামী লীগ জনসভা করতে না দেওয়ায় বিএনপি নেতারা যে তাঁদের কথা একেবারেই জনগণকে জানাতে পারছেন না, তাও নয়। তাঁরা প্রায় প্রতিদিনই সাংবাদিকদের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন, ব্রিফিং করছেন। জনসভার চেয়ে এখন সেটাও কম কার্যকর নয়। সংবাদপত্র ও টিভির কল্যাণে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষের কাছে যাচ্ছে। বিএনপি জনসভা না করতে পারলেও আওয়ামী লীগের নেতারাই তাঁদের সভায় যেভাবে দলটির পক্ষে ‘প্রচার’ চালাচ্ছেন, তাতে বিএনপিই লাভবান হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো বিএনপিকে জনসভা করতে না দিলে দলের নেতারা কী কী করতে পারেন। প্রথমত, তাঁরা একেবারেই চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে পারেন। তাঁদের হয়ে আওয়ামী লীগের নেতারাই ‘প্রচার’ কাজটি চালাবেন। দ্বিতীয়ত, জনসভা করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে তাঁরা আগের মতো পুরোনো ধারার আন্দোলনে ফেরার চেষ্টা করতে পারেন। দেশ এ ধরনের কোনো দিকে যাক, তা কারও জন্যই ভালো হবে না। তৃতীয়ত, বিএনপির উচিত হবে তাঁদের কথাগুলো দেশবাসীকে বিকল্প উপায়ে জানানো। এ ক্ষেত্রে তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মূলধারা গণমাধ্যমকে ব্যবহার করতে পারেন।
তবে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে থাকে, বিএনপিকে ঘরে বন্দী করে রেখে কিস্তিমাত করা যাবে, তাহলে বলব, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। কিস্তিমাত করতে হলে জনগণের হৃদয় জয় করতে হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও স্বীকার করেছেন, ‘বিএনপি আন্দোলনে দুর্বল হলেও জনসমর্থনে দুর্বল নয়।’ তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের উদাহরণ টেনেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রমাণে করে না যে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন বেড়েছে। সেখানে তাদের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সবাইকে নিয়ে সিটি করপোরেশন পরিচালনা করার যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, তা বিরল। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সমর্থকেরাও তাঁকে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে তিনি জাতীয় কোনো ইস্যুকে সামনে আনেননি।
এখানে উল্লেখ্য, ২০১১ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীকে সেলিনা হায়াৎ আইভী এক লাখেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেছিলেন। তাই নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের জয়ে আওয়ামী লীগের খুব বেশি উল্লসিত হওয়ার কারণ আছে বলে মনে করি না।
0 comments:
Post a Comment