এ ছাড়া সেতুটি ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় নির্মাণ করা হচ্ছে পৃথক রেলসেতু। পাশাপাশি যমুনা নদীতে টানেল নির্মাণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সেতুর দুপাশের দুই লেনবিশিষ্ট সড়ককে চার লেনে উন্নীত করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের আগে সম্ভাব্য যান চলাচলের যে সংখ্যা ধরা হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন সেতুটি নির্মিত হয়, তখন দৈর্ঘ্যরে ভিত্তিতে এটি ছিল বিশ্বের ১১তম সেতু। উদ্বোধনের পর ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে এতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৯২ হাজার ১৪৯টি। ১৮ বছরে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। নির্মাণের পর সেতুটির আয়ুষ্কাল ধরা হয় ৯৯ বছর। যদিও ছয় বছরের মাথায় স্থাপনাটিতে ফাটল ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্ত পড়েছে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরে আর পশ্চিমপ্রান্ত সিরাজগঞ্জে। সেতুটি চার লেনের হলেও সড়ক দুই লেনের।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেতুর দুপাশে গাড়ির জট লেগেই রয়েছে। আর একটি ট্রেন থামিয়ে আরেকটি ট্রেন অতিক্রম করতে হয়। তাও ঝুঁকি এড়াতে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে। সাধারণত ৮০ কিলোমিটার গতিতে চললেও সেতুটি অতিক্রম করে ২০ কিমি গতিতে। এতে অতিরিক্ত সময় লাগে ৩০ মিনিট। ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি। ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। সড়কপথের বিকল্প হিসেবে নৌপথেও ঝুঁকি নিয়ে ট্রলার চলছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, দিনে গড়ে ন্যূনতম ১৩ হাজার গাড়ি পারাপার হয় বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে। এ বছর অক্টোবরে পারাপার হওয়া যানের সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ৬২২টি। এর মধ্যে সেতুর পূর্ব প্লাজায় ৩৪ কোটি ৩৮ লাখ ৪২ হাজার ৫১০ টাকা এবং পশ্চিম প্লাজায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৮০ টাকা টোল আদায় হয়েছে। দুই প্রান্ত মিলিয়ে সর্বমোট টোল আদায় হয়েছে ৩৪ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৯০ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক গড়ে টোল আদায়ের পরিমাণ এক কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ২৫ টাকা। গাড়ির চাপ সামলাতে বঙ্গবন্ধু সেতুর উভয় পাশে বিদ্যমান সড়ককে চার লেনে উন্নীত করতে হচ্ছে।
এ জন্য টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে হাটিকুমরুল হয়ে রংপুর পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি ২০২১ সালের আগস্টের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং সেতু কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। নৌমন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানবাহনের চাপ কমানো এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার সঙ্গে যাতায়াত সহজ করতে বাহাদুরাবাদ-বালাসীঘাট নৌরুটে পুনরায় চালু করা হবে ফেরি সার্ভিসটি। এ জন্য পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পর সঙ্গত কারণেই অপ্রয়োজনীয় বলে বন্ধ করে দেওয়া হয় এ রুটে ফেরি চলাচল। ২০০৪ সালের ৪ জুলাই ঘাট দুটিও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এ বিষয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ফেরি চালু করা হচ্ছে। এটি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর বহুদিনের দাবি বলেও জানান তিনি। বলেন, এর ফলে রাজধানীর সঙ্গে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার যোগাযোগে সুবিধা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনে নৌমন্ত্রণালয়ের পাঠানো ডিপিপিতে বলা হয়েছে, যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পর ফেরি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়ায় রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর বিশাল জনগোষ্ঠী বিপাকে পড়ে। যমুনা সেতু হয়ে অনেক পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হয়। এতে সময়ক্ষেপণ ছাড়াও ব্যয় হয় অতিরিক্ত অর্থ। এ কারণে সেতু এড়িয়ে ঝুঁঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকায় ওই অঞ্চলের যাত্রীরা নদী পারাপার হন। এ অবস্থায় আবার ফেরি চালু করা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের আগে দিনাজপুর থেকে রংপুর হয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসীঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করত। রংপুর বিভাগের আট জেলার ট্রেনযাত্রীরা বালাসীঘাট থেকে রেলওয়ের ফেরিতে জামালপুরের বাহাদুরাবাদে পৌঁছে ময়মনসিংহ ও ঢাকায় যাতায়াত করতেন। এতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগত। ২০০৪ সালে বালাসীঘাট-বাহাদুরাবাদঘাট পরিত্যক্ত ঘোষণার পাশাপাশি রেলওয়ের ফেরি চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। এখন বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ট্রেন যাওয়ায় কয়েকটি জেলা ঘুরে রংপুর অঞ্চলে যেতে হয়। এতে কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে।
এদিকে বাহাদুরাবাদ-বালাসীঘাট নৌরুটে নতুনভাবে ফেরি চালু করলে ড্রেজিং করতে হবে। কারণ শুষ্ক মৌসুমে এ রুটে প্রয়োজনীয় গভীরতা থাকে না। প্রয়োজন হবে নতুন করে অবকাঠামো নির্মাণ। এ ছাড়া ৭২ কিলোমিটার সংযোগ সড়কেরও উন্নয়ন করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের ডিপিপিতে সব মিলিয়ে যমুনা নদীতে ফেরি সার্ভিস চালু করতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে দুবছর। সূত্র মতে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে, অনুমোদনপূর্ব পরিদর্শনের জন্য পরিকল্পনা কমিশন একটি কমিটি গঠন করেছে। বাহাদুরাবাদ-বালাসীঘাট নৌরুট পরিদর্শন শেষে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর মূল নকশায় ভবিষ্যতে মিটারগেজ রেললাইন নির্মাণের সংস্থান থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা পরিবর্তন করে ‘সীমিত লোড ও গতিতে ট্রেন পরিচালনার’ সিদ্ধান্ত হয়। এ সেতুতে ব্রডগেজ কনটেইনারবাহী ফ্ল্যাট ওয়াগন চলাচল করতে পারে না। এ ছাড়া লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) সংখ্যা একটির মধ্যে সীমিত রাখতে হয়। ফলে রেলওয়ে অপারেশনে সমস্যা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু সেতুর উত্তর পাশে পৃথক আরেকটি রেলসেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এ জন্য ডিপিপি পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, উত্তরাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের মানুষের সহজ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে যমুনা নদীর ওপর পৃথক রেল সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। প্রকল্প সূত্র মতে, ২০১৮ সালের শেষ দিকে যমুনা রেলসেতুর ভৌত কাজ শুরু হবে। নির্মাণকাল ধরা হয়েছে সাড়ে তিন বছর। এর আগে সেতুটি নির্মাণে এডিবির রিজিওনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন (আরসিআই) প্রকল্পের আওতায় ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। এখন বিস্তারিত নকশার পালা। এ জন্য পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে।
অন্যদিকে সেতু বিভাগের আওতায় যমুনা নদীতে টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যয়বহুল এ প্রকল্পে শুধু সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্যই ১৩০ কোটি টাকা অনুমিত ব্যয় ধরা হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা শিগগির পাঠানো হচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনে। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায় সেতু কর্তৃপক্ষ। এর আগে টানেলটি নির্মাণে অর্থায়নের জন্য পিডিপিপি ইআরডির মাধ্যমে জাপান দূতাবাসে প্রস্তাবনা পাঠায় সেতু বিভাগ। ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই টানেল নির্মাণে অর্থায়নে সম্মতি জানিয়েছিল জাইকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাইকা জানায়, যমুনা নদীতে পৃথক রেলসেতু হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত টানেল আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জরুরি কিনা এই মর্মে কিছু পর্যবেক্ষণ দরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ফিজিবিলিটি স্টাডির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। টানেলটি নির্মাণের যুক্তি হিসেবে সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, এর ফলে দেশের বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। ভবিষ্যতে এটি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য ও মালামাল উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পরিবহনের পথ সহজ করবে। তা ছাড়া বলা হয়েছে, সেতু নির্মাণ হলে পিলারের কারণে পলি জমে চরের সৃষ্টি হয়। টানেলে এ জটিলতা নেই। যমুনা টানেলে রেলপথ ও সড়কপথের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন লাইন রাখার কথা।
সেতু বিভাগের মতে, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থেকে পশ্চিমে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি পয়েন্ট পর্যন্ত টানেলটি নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘কনস্ট্রাকশন অব মাল্টি-মোড্যাল রোড-রেল টানেল আন্ডার দ্য রিভার যমুনা’ শিরোনামে সেতু বিভাগের তৈরি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (পিডিপিপি) বলা হয়েছে, টানেলটি নির্মাণে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা।
0 comments:
Post a Comment